অমিত্রাক্ষর প্রবর্তক মহাকবি মাইকেলের জন্মবার্ষিকী আজ

Share Now..

এস আর নিরব যশোরঃ
বাংলা কবিতায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবক্তা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৮তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৮২৪ সালের আজকের (২৫ জানুয়ারি) এই দিনে যশোরের কেশবপুর উপজেলার কপোতাক্ষ নদতীরে সাগরদাঁড়িতে জন্মগ্রহণ তিনি। জন্মদিনকে ঘিরে প্রতি বছর চারদিন আগেই (২২ জানুয়ারি থেকে) কবির বাস্তুভিটায় বসে সপ্তাহব্যাপী মধুমেলা। তবে করোনার কারণে এ বছর হচ্ছে না সেই মেলা। তবে কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একদিন অনুষ্ঠান হবে শুধু।

আজ মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৮ তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে প্রতিবছর যশোরের কেশবপুরের কপোতাক্ষ পাড়ের তীর্থভূমি সাগরদাঁড়িতে বসে কমপক্ষে সপ্তাহব্যাপী মধুমেলা। এ আয়োজনকে ঘিরে মধুভক্তদের মাঝে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এ বছরও হচ্ছে না মেলা। স্বল্পপরিসরে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মহাকবি মাইকেলের জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হবে।

সাগরদাঁড়ি গ্রামের স্থানীয় জমিদার বাবা রাজনারায়ন দত্ত আর মাতা জাহ্নবী দেবীর কোল আলোকিত করে সোনার চামচ মুখে নিয়ে বাঙালির প্রিয় কবি এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। প্রাকৃতিক অপূর্ব লীলাভূমি, পাখি ডাকা, ছায়া ঢাকা, শষ্য সম্ভারে সম্বৃদ্ধ সাগরদাঁড়ি গ্রাম আর বাড়ির পাশে বয়ে চলা স্রোতস্বিনী কপোতাক্ষের সাথে মিলেমিশে তার সুধা পান করে শিশু মধুসূদন ধীরে ধীরে শৈশব থেকে কৈশোর এবং কৈশোর থেকে পরিণত যুবক হয়ে উঠেন। কপোতাক্ষ নদ আর মধুসূদন দু’জনার মধ্যে গড়ে উঠে ভালোবাসার এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। মধুকবি ১৮২৪ সালে যখন জন্ম গ্রহণ করেন, সে সময়ে আজকের এই মৃত প্রায় কপোতাক্ষ নদ কাকের কালো চোখের মত স্বচ্ছ জলে কানায় কানায় পূর্ণ আর হরদম জোয়ার ভাটায় ছিল পূর্ণযৌবনা। নদের প্রশস্ত বুক চিরে ভেসে যেত পাল তোলা সারি সারি নৌকার বহর আর মাঝির কণ্ঠে শোনা যেত হরেক রকম প্রাণ উজাড় করা ভাটিয়ালী ও মুর্শিদি গান। শিশু মধুসূদন এসব অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখতেন আর মুগ্ধ হতেন। স্রোতস্বিনী কপোতাক্ষের অবিশ্রান্ত ধারায় বয়ে চলা জলকে মায়ের দুধের সাথে তুলনা করে কবি রচনা করেন সেই বিখ্যাত সনেট কবিতা ‘কপোতাক্ষ নদ’। ‘সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে, সতত তোমারি কথা ভাবি এ বিরলে’।

ছেলেবেলায় নিজ গ্রামের এক পাঠশালায় মাওলানা লুৎফর রহমানের কাছে শিশু মধুসূদন তার শিক্ষা জীবন শুরু করেন। পাশাপাশি গৃহ শিক্ষক হরলাল রায়ের কাছে বাংলা ও ফারসি ভাষায় শিক্ষালাভ করেন। কিন্তু গাঁয়ের পাঠশালায় তিনি বেশি দিন শিক্ষালাভ করতে পারেননি। আইনজীবী বাবা রাজনারায়ন দত্ত কর্মের জন্য পরিবার নিয়ে কলকাতার খিদিরপুরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন।

১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কবি মধুসূদন খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন এবং পাশ্চাত্য সাহিত্যের দুর্নিবার আকর্ষণবশত ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। এই সময় তিনি হিন্দু কলেজ পরিত্যাগ করে শিবপুরস্থ বিশপস্ কলেজে ভর্তি হন এবং চার বৎসর সেখানে অধ্যায়ন করেন। এখানে অধ্যয়নকালে তিনি গ্রিক, ল্যাটিন, ফরাসি, হিব্রু প্রভৃতি ভাষা আয়ত্ত করেন।

খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করায় মাইকেল পিতার অর্থ সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়ে ১৮৪৪ সালে পারিবারিক স্নেহের নোঙ্গর ছিঁড়ে মাদ্রাজের পথে পাড়ি জমান। এখানে প্রথমে মাদ্রাজ ‘মেল অরফ্যান অ্যাসাইলাম’ বিদ্যালয়ে ইংরেজি শিক্ষকের চাকরি গ্রহণ করেন। পরে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনায় নিযুক্ত হন। মাদ্রাজ প্রবাসকালে তাঁর সাহিত্য প্রতিভা উজ্জ্বীবিত হয়ে ওঠে। এই সময়ে তিনি লিখতেন ইংরাজি কাব্য Captive Lady’ ‘I Visions of the past’ এখানে তিনি কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদক ও সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৪৪ সালে কলকাতার Circulator পত্রিকায় তাঁর অনূদিত পারস্যের কবি শেখসাদীর একটি গজল ‘Ode’ নামে প্রকাশিত হলে ইংরাজি রচনায় তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর পরিলক্ষিত হয়।

মাইকেল মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় ফিরে এসে কবি দেখলেন, তাঁর পিতা-মাতা ইতঃপূর্বেই ইহজগৎ ত্যাগ করেছেন এবং তাঁদের অনেক সম্পত্তি অন্যরা দখল করে নিয়েছে। অগত্যা মধুকবি পুলিশ আদালতে সামান্য কেরানির চাকরি গ্রহণ করেন।

মধুসূদনের দুর্দিনে একমাত্র সুহৃদ ছিলেন বিদ্যাসাগর। আপন অসচ্ছলতা সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর বহু অর্থ ব্যয় করেন মধুসূদনের ব্যারিস্টারি পড়ার জন্যে। লন্ডনের ‘গ্রেজ ইন’ থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরে ১৮৬৬ সালের ১৭ নভেম্বর কলকাতা বারে যোগদান করেন এবং ১৮৬৭ সালের ৭ মে হাইকোর্ট বারে যোগদান করেন। পরে তাঁকে প্রিভিউ কাউন্সিলের ‘আপিল একজামিনার’ হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

পরে মধুসূদন আকৃষ্ট হন নিজের মাতৃভাষার প্রতি। এই সময়েই তিনি বাংলায় নাটক, প্রহসন ও কাব্য রচনা করতে শুরু করেন। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি অমিত্রাক্ষর ছন্দে রামায়ণের উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত মেঘনাদ বধ কাব্য নামক মহাকাব্য। এছাড়া দ্য ক্যাপটিভ লেডি, শর্মিষ্ঠা, কৃষ্ণকুমারী (নাটক), পদ্মাবতী (নাটক), বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ, একেই কি বলে সভ্যতা, তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য, বীরাঙ্গনা কাব্য, ব্রজাঙ্গনা কাব্য, চতুর্দশপদী কবিতাবলী, হেকটর বধ তাঁর সাহিত্য চর্চার উল্লেখযোগ্য ফসল।

মাইকেলের ব্যক্তিগত জীবন ছিল নাটকীয়, করুণ ও মর্মস্পর্শী। বিদেশিনী হেনরিয়েটার প্রেমে পড়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত হিন্দু ধর্ম পরিত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরে বসে মহাকবি লিখেন তাঁর ‘কপোতাক্ষ নদ’ এবং ‘বঙ্গভাষা’র মতো বিখ্যাত কবিতা। যে কবিতায় তিনি মাতৃভাষা বাংলার প্রতি তার অন্তরের গভীর অনুভবের কথা ব্যক্ত করে বলেন, ‘হে বঙ্গ ভা-ারে তব বিবিধ রতন’।
সেখানে চলাফেরার এক পর্যায়ে মধুসূদন পর্যায়ক্রমে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। শেষ জীবনে ভয়ংঙ্করভাবে অর্থাভাব, ঋণগ্রস্থ ও অসুস্থতায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন দুর্বিষহ উঠে। ফিরে আসেন আবারো কলকাতায়। এসময় তার পাশে ২য় স্ত্রী ফরাসি নাগরিক হেনরিয়েটা ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। এরপর সকল চাওয়া পাওয়াসহ সকল কিছুর মায়া ত্যাগ করে ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলকাতার একটি হাসপাতালে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মহাকবির মৃত্যুর পর ১৮৯০ সালে কবির ভাইয়ের মেয়ে মানকুমারি বসু সাগরদাঁড়িতে প্রথম স্মরণসভার আয়োজন করেন। সেই থেকে শুরু হয় মধুজন্মজয়ন্তী ও মধুমেলার। কিন্তু বৈশি^ক মহামারি করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় এ বছর মধুমেলা হচ্ছে না। শুধুমাত্র একদিনের আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। এছাড়া অনুষ্ঠানের আগে মাইকেল মধুসূদনের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হবে।

স্থানীয়রা জানান, ‘৮০ দশকে মধু কবির জন্মভূমি সাগরদাঁড়ির ‘পৈত্রিক বসতবাড়ি’ প্রত্বতত্ত্ব অধিদপ্তর সার্বিক পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পরে কিছুটা ঘষামাজা করে পুরাতন জীর্ণশীর্ণ ভগ্নদশা থেকে কিছুটা বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯৭ সালে কবির জন্মজয়ন্তী ও মধুমেলা উদ্বোধন কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাগরদাঁড়িতে পর্যটন কেন্দ্র ও মধুপল্লী গড়ে তোলার ঘোষণা দেন। যার প্রেক্ষিতে পর্যটনের একটি রেঁস্তোরাসহ কেন্দ্র ও মধুপল্লী নির্মাণ করা হয়। তবে ভ্রমণ পিপাসু ও পর্যটকদের জন্য এখানে গড়ে উঠেনি বিশ্রামাগার ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.