চীন আর ভারতের সীমান্ত স্থাপনা যেভাবে হিমালয়ে বিপদ তৈরি করছে

Share Now..


ভারতের উত্তরাঞ্চলে হিমালয় ঘেঁষা শহর জোশীমঠের ভূমি এবং আশেপাশের এলাকায় ফাটল দেখা দেয়ার পর বেশ কয়েকদিন ধরেই সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে উঠেছে। শহরটি ডুবে যাচ্ছে কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিমালয় ঘিরে আরও বড় একটি ভয়ের বিষয় আস্তে আস্তে পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।তারা জানিয়েছেন, হিমালয় অঞ্চল ঘিরে যে হারে ভারত ও চীন নানা ধরনের অবকাঠামো তৈরি করতে শুরু করেছে, তাতে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক জলবায়ুর উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার কারণে হিমালয় অঞ্চলের নাজুক ইকো সিস্টেম হুমকির মুখে পড়েছে, বড় বড় হিমবাহগুলো আর স্থায়ী বরফে ঢাকা এলাকাগুলোতে বরফ গলতে শুরু করেছে।বিশেষ করে ভারত ও চীনের যেসব এলাকায় মহাসড়কগুলো তৈরি করা হচ্ছে, রেলওয়ের লাইন বসানো হয়েছে, টানেল তৈরি করার জন্য পাহাড় খনন করা হচ্ছে, বাঁধ আর বিমানবন্দর তৈরি করা হচ্ছে, উভয় অংশেই এই চিত্র আরও পরিষ্কার হচ্ছে।অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পানিবিদ্যার অধ্যাপক আন্দ্রেস কাব জানান, আসলে এর মাধ্যমে বিপদকে আরও কাছে ডেকে আনা হচ্ছে। ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের চামোলি জেলায় ২০২১ সালে ভয়াবহ তুষার ধ্বসের কারণ নিয়ে যৌথভাবে তিনি একটি বই লিখেছেন।

বিচ্ছিন্ন অনেকগুলো ঘটনা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। কিন্তু যখন সেসব ফলাফল একত্রে মিলিয়ে দেখা হয়েছে, তখন দেখা গেছে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিপদের ঝুঁকি বাড়ছে, যে এলাকাটিকে ভারত ও চীন দুই দেশই তাদের সীমানা বলে মনে করে।

এই সীমানাকে বলা হয় লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল। ন্যাচারাল হ্যাজার্ড অ্যান্ড আর্থ সিস্টেম সায়েন্স ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর আর অক্টোবর মাসে ভারতের জাতীয় মহাসড়ক এনএইচ-সেভেনের প্রতি কিলোমিটারে অন্তত একটি করে ভূমিধ্বস হয়েছে। যার ফলে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

অন্য গবেষণাগুলোতেও অনেকটা একই ধরনের বিপদের ঝুঁকি শনাক্ত করা হয়েছে। ইউরোপীয় জিওসায়েন্স ইউনিয়নে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘পরিবেশগত অবস্থার পাশাপাশি নতুন নতুন রাস্তা তৈরি করা বা প্রশস্ত করার কর্মকাণ্ড নতুন ভূমিধ্বস তৈরির পেছনে ভূমিকা রেখেছে। এসব ভূমিধ্বস প্রায়ই ছোটখাটো বা অগভীর হয়ে থাকে, কিন্তু তাতেও প্রাণহানি হয়। কারণ এতে যানবাহন চলাচল এবং স্থাপনাগুলোর গুরুতর ক্ষতি হয়ে থাকে।’

এই এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূমিধ্বস এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিনে দিনে খুব সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠেছে। এমনকি গত বছর বর্ষাকালে উত্তরাখণ্ডে নবনির্মিত চারধাম মহাসড়কের কিছু অংশ ভেঙ্গে পড়েছিল। চামোলি তুষার ধসের সময় ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত আর দুইটি নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

সেই ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করার সময় ভারতের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দেখতে পেয়েছে, ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলা করা নিয়ে পরিকল্পনা করার সময় তাদের কর্মকর্তারা জলবায়ু এবং অবকাঠামো সম্পর্কিত ঝুঁকিগুলোকে বিবেচনায় নেয়নি।

হিমালয় অঞ্চলের জন্য অবকাঠামো বা স্থাপনাগুলো যে হুমকি তৈরি করছে, এই সম্পর্কিত বিবিসির প্রশ্নের উত্তর দেয়নি ভারতের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি হিমালয়ের ভারতের দিকে যেমনটা রয়েছে, চীনের দিকেও সমান ঝুঁকি রয়েছে।

বিশেষ করে চিরস্থায়ী বরফ এলাকাগুলোয় তৈরি করা অবকাঠামো বরফ গলিয়ে দিতে চরম হুমকি তৈরি করেছে। গত অক্টোবরে কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, চীনের কিংহাই তিব্বত মালভূমিতে প্রায় ৯ হাজার ৪০০ কিলোমিটার রাস্তা, ৫ হাজার ৮০ কিলোমিটার রেলপথ আর ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি বিদ্যুৎ লাইন এবং হাজার হাজার ভবন এসব চিরস্থায়ী বরফ এলাকায় রয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘চিরস্থায়ী বরফ এলাকাগুলো গলতে শুরু করায় ২০৫০ সালের মধ্যে ৩৪ শতাংশ সড়ক, ৩৮ শতাংশ রেলপথ আর ৩৭ শতাংশ বিদ্যুতের লাইন, ২১ শতাংশ স্থাপনা বড় ধরনের হুমকিতে পড়তে পারে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *