যে কারণে বায়ুদূষণের অশনি সংকেতে বাংলাদেশ

Share Now..

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। করোনার প্রকোপে লকডাউন পরিস্থিতিতে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও বায়ুদূষণের সমস্যা কিছুটা কমেছিল। স্বাভাবিক জীবন শুরু হতে না হতেই আবার শুরু হয়েছে বায়ুদূষণ। ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, প্রতি বছর বায়ুদূষণের ফলে ২১ শতাংশ নিউমোনিয়া, ২০ শতাংশ স্ট্রোক, ৩৪ শতাংশ হৃদরোগ, ১৯ শতাংশ সিওপিডি এবং ৭ শতাংশ ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণে মারা যায়।

বৈশ্বিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউ এয়ারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের শীর্ষ ১০০ দূষিত শহরের মধ্যে ৪৬টিই ভারতের। এরপর ৪২টি শহর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। আইকিউ এয়ারের বায়ুমান সূচক অনুযায়ী, বিশ্বে বায়ুদূষণে রবিবার (৩০ নভেম্বর) ঢাকার অবস্থান ৯ম। বায়ুমান সূচকে (একিউআই) ঢাকার স্কোর ১৬২। ২৮৬ স্কোর নিয়ে তালিকায় দূষণের শীর্ষে রয়েছে দিল্লি। এর আগে ২৩ নভেম্বর বায়ুদূষণে শীর্ষ অবস্থান ছিল ঢাকার দখলে। টানা কয়েক বছর ধরে বায়ুদূষণে ঢাকা বিশ্বের শহরগুলোর মধ্যে প্রথম দিকেই থাকছে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ জনের মধ্যে নয় জন দূষিত বাতাসে শ্বাস নেন এবং বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর প্রধানত নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশে আনুমানিক ৭০ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে। শুধু তাই নয় সম্প্রতি শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত ‘এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স’র তথ্যমতে, ঢাকায় বায়ুদূষণ না থাকলে মানুষ আরও প্রায় ৭ বছর সাত মাস বেশি বাঁচতে পারতো। এছাড়া, একই কারণে সারাদেশে মানুষের গড় আয়ু কমেছে প্রায় ৫ বছর চার মাস।

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ ও ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ঢাকার ১২টি স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পিএম ২.৫-এর পরিমাণ পর্যালোচনা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে ঢাকা শহরে বায়ু দূষণ ১৭ শতাংশ বেড়েছে। যেসব এলাকায় গাড়ি নেই, সেসব এলাকায় পিএম ২.৫-এর মান সবচেয়ে কম (৪০ পিএম ২.৫), কিছু এলাকায় অযান্ত্রিক গাড়ি চলাচল করে, সেই এলাকাগুলোয় পিএম ২.৫-এর পরিমাণ তুলনামূলক কম (৪৬.০ পিএম ২.৫)।

অন্যদিকে যেসব এলাকায় যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক উভয় গাড়ি রয়েছে, সেখানে পিএম ২.৫-এর পরিমাণ তুলনামূলক একটু বেশি (৮৪.৭ পিএম ২.৫)। যেসব এলাকায় যান্ত্রিক গাড়ি চলাচল করে, সেখানে পিএম ২.৫-এর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি (১৭২.২ পিএম ২.৫)। গবেষণা থেকে বলা যায়, যেসব এলাকায় যান্ত্রিক গাড়ির পরিমাণ বেশি, সেসব এলাকায় বায়ুদূষণের পরিমাণও বেশি।

সম্প্রতি ‘কারেন্ট সায়েন্স’-এর এক গবেষণায় প্রকাশ, বায়ুদূষণের কারণে অন্য অসুখ-বিসুখের পাশাপাশি অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস নামক রোগের গতি বাড়ছে। যার অর্থ, রক্তবাহী ধমনীতে চর্বি জমে রক্ত চলাচল কমে যাওয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাভাবিক নিয়মে বয়স বাড়লে, ওজন বেশি হলে এবং ভুল খাদ্যাভ্যাসের ফলে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস হয় ঠিকই। তবে বায়ুদূষণ এই রোগের গতি আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে হৃদরোগ ও ব্রেইন স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ২ হাজার ৭৫০ জন মারা যায় বায়ুদূষণজনিত নানা শারীরিক সমস্যায়। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, বাতাস, শব্দসহ অন্যান্য দূষণ মানুষ ও পরিবেশের অন্য প্রাণীর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। গাড়ি ও কারখানার ধোঁয়ার পাশাপাশি বাড়িতে রান্নার জ্বালানির কাজে ব্যবহৃত লাকড়ির চুলা বা কেরোসিন স্টোভের ধোঁয়াও আমাদের হৃদপিণ্ড, ফুসফুসসহ সামগ্রিক শরীরের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতি করে। রান্নার ধোঁয়াতে থাকে সূক্ষ্ম ভাসমান কণা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), নাসা, বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদফতর, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন গবেষণায় বাংলাদেশে বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে পরিবহন বিশেষত ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও ইটভাটাকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.